হাকালুকি হাওরে জঙ্গল পুরনো ঐতিহ্যে ফেরার আশা

স্টাফ রিপোর্টার

এশিয়ার বৃহত্তম হাওর “হাকালুকি হাওর “সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার ৫ টি উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত।মিঠাপানির এ হাওর ঘিরে রয়েছে অনেক ঐতিহ্য। জলজ,মৎস্য,কৃষি এই তিন উপাদানের জন্য এক সময় হাওর টি বিখ্যাত হলেও জলজ উদ্ভিদ ছাড়া মৎস্য ও কৃষিতে সাফল্যতা রয়েছে হাওরটির বুকে।

তথ্য সূত্রে জানা যায়, এশিয়ার অন্যতম ও দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকির আয়তন প্রায় ১৮ হাজার ১৫০ হেক্টর।ছোটবড় মিলে প্রায় ২৩৬ টি বিল রয়েছে এই হাওরে।অসংখ্য খালগুলো দিয়ে কৃষকরা পানি সেচ করে কৃষি চাষ করেন।এসব খাল ,বিলে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।বর্ষা মৌসুমে বিল ও খাল পানিতে একাকার হয়ে যায়।শীতকালে প্রচুর বিদেশী পাখির আগমন ঘটে এই হাওরে।বরফে ঢাকা পশ্চিমা দেশ সাইবেরিয়া ,মঙ্গোলিয়া ,তিব্বত ,রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ থেকে পাখিগুলো আসে। শীতকমে গেলে তারা আবার ও তাদের দেশে ফিরে যায়।
বোরো আমন চাষের জন্য হাকালুকি হাওর প্রসিদ্ধ। শীতের কনকনে শীতে কৃষক ভোরে সূর্যের আলো ছড়ার সাথে সাথে হাওরে গিয়ে কৃষিকাজ করেন।
বর্ষাকালে হাওরের সবটুকু জুড়ে পানি আর পানি।সেই পানিতে বাস করেন হাজার রকমের ছোট বড় দেশীয় মাছ।বর্ষা মৌসুম চলে গেলে পানি কমে যাওয়ার কারনে মাছগুলো আশ্রয় নেয় ছোট বড় বিলগুলোতে। এসব বিলগুলো ইজারা দিয়ে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে বাংলাদেশ সরকার।

মৎস্য ,কৃষি কিংবা অতিথি পাখির কোলাহলে ভরপুর হাকালুকিতে একটা সময় বনাঞ্চল ছিল।প্রায় ৩০-৪০ বছর পূর্বেও হাকালুকি হাওরের বনে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ছিল।এসবের মধ্যে মেছো বিড়াল (মেছো বাঘ) শিয়াল সহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপের বসবাস ছিল।হাওরের মধ্যে হিজল ,করচের বন ছিল পাহাড়ী জঙ্গলের মত।এসব বনের গাছের নিচে মাছগুলো ডিম দিতো যাতে শিকারীরা সহজে জাল ফেলে পোনা মারতে না পারে।হাওরগুলো নিলামে দেওয়ার কারনে ইজারাদারেরা এসব বন কেটে বিলে কাটাঁ হিসেবে ব্যবহুত করার কারনে আগের মত সেই বনাঞ্চল নেই হাওরে।১৯৯৯ সালে হাকালুকি হাওর কে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার পর ও বিভিন্ন অজুহাতে কাটা হয় এসব গাছ।শুধু মাত্র ২০২১ সালে বাধঁ নির্মাণের অজুহাতে এক মালাম বিল থেকে প্রায় বিশ হাজার গাছ কাটা হয়েছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) ফরেন এন্ড কমনওয়েলথ ডেভেলপমেন্ট অফিসের অর্থায়নে হাকালুকি হাওরের বনাঞ্চল পূর্বের মত ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন ধরনের প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।বিগত কয়েক বছরে প্রায় ৫০ হাজার হিজল,করচ ও বরুন গাছ রোপন ও এসবের পর্যবেক্ষণের জন্য সংস্থা থেকে পাহারাদার নিয়োগ দেওয়ার কারনে পূর্বের মত ইজারাদারেরা সহজে গাছ কাটতে পারেন না।প্রকৃতির পরিবেশ রক্ষা,মাছের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এই বনাঞ্চল রক্ষার দাবি এলাকাবাসীর।

হাওর পাড়ের বাসিন্দা ধীরেন্দ্র বিশ্বাস বলেন, হাওরে আগে মাছের পাশাপাশি অনেক গাছ ছিলো।আমরা মাছ মারতে গেলে ও সহজে জাল ফেলা যেতো না।কিছুদিন আগে থেকে এসব গাছ রোপন করার কারনে কিছুটা সৌন্দর্য ফিরে আসছে।

সিএনআরএসের নব পল্লব প্রকল্পের ফিল্ড ম্যানেজার মো তৌহিদুর রহমান বলেন,একটা সময় হাকালুকি হাওরে প্রচুর জলজ গাছ ছিলো।স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বন বিভাগের আওতা থেকে ভূমি মন্ত্রনালয়ের অধীনে হাওরের ভূমির দায়িত্ব চলে যাওয়ার পর থেকে তদারকির অভাবে গাছ কেটে জমি তৈরীর কারনে গাছ গুলো কাটা হয়েছে।সিএনআরএসের নব পল্লব প্রকল্পের আওতায় সেই পুরনো বনাঞ্চল ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের সাফল্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আবার ও জলজ বৃক্ষে হাকালুকি তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে এ কর্মকর্তা আশা ব্যক্ত করেন।

পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম কিম বলেন, হাকালুকি হাওরে জলজ ও হিজল-করচসহ অনেক বনের বৈচিত্র্যময় গাছপালা ছিলো। এগুলো অনেকটাই উজাড় হয়ে গেছে । এখন যারা এই উদ্যোগ নিয়েছে নিঃসন্দেহে ভাল। কিন্ত তখনই এটিই পরিপূর্ণতা পাবে যখন আগের মতো গাছগুলি দেখা যাবে। এ ছাড়া আর যাহাতে কোন
দুষ্কৃতিকারীরা এই গাছ গুলো কাটতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
এটি এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হওয়ায় এখানে হিজল-তমাল জাতীয় জলাভূমি উপযোগী গাছের আধিক্য রয়েছে যা মাছের প্রজনন ও আশ্রয়স্থল।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: মহি উদ্দিন বলেন,
সিএনআরএস যে উদ্যোগটি নিয়েছে সেটি খুবই ভালো। হাকালুকি হাওরের বনাঞ্চল পূর্বের মত ফিরিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি এ ধরনের প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ ছাড়া আমাদের সাথে আলাপ করে এসবের পর্যবেক্ষণের জন্য সংস্থা থেকে পাহারাদার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আমরাও তাদেরকে সহযোগিতা করছি।

Theme Developed BY NewsFresh