কুলাউড়ার নানাবিধ সমস্যার কথা সংসদে তুলে ধরলেন এমপি শওকতুল ইসলাম

মো. মহি উদ্দিন

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নানাবিধ সমস্যার কথা জাতীয় সংসদে তুলে ধরলেন আলহাজ¦ শওকতুল ইসলাম শকু এমপি। গত রবিবার (২৯ মার্চ) প্রথমবার ও (৩০ মার্চ) দ্বিতীয় বারের মতো মহান জাতীয় সংসদে বক্তব্যের শুরুতে তিনি সংসদ পরিচালক ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে মহান রবের প্রতি শুকরিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মৌলভীবাজার-২ আসনের সর্বস্তরের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এমপি শওকতুল ইসলাম রোববার জাতীয় সংসদে তাঁর প্রথম বক্তব্যে অন্য কোনো প্রসঙ্গ না টেনে হাসপাতালের নানাবিধ সমস্যা চিত্র তুলে ধরেন। এই বক্তব্যটি বিভিন্ন টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হয়।

বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বিভাগে গিয়ে দেখি ইমার্জেন্সি শব্দটা বেমানান। এখানে কোন টেকনিশিয়ান নাই, ভালো নার্স নেই, গাইনী বিশেষজ্ঞ নেই, ইসিজি মেশিন নেই, এক্সরে মেশিন নেই। নেই নেই শুধু নেই আর নেই। মাননীয় মন্ত্রীর কাছে আমার হাসপাতালে শয্যা বাড়ানোর জন্য দাবি জানাচ্ছি। এই বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। এতে কুলাউড়ায় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও সর্বস্তরের লোকজন এবং প্রবাসে থেকে অনেকেই শওকতুল ইসলাম এমপিকে অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানিয়ে ফেসবুকে শত শত পোস্ট করেন। এদিকে সোমবার (৩০ মার্চ) বিকেলে সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে আলহাজ¦ শওকতুল ইসলাম শকু এমপি কুলাউড়ার প্রায় ১০টি সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে তিনি বলেন, কুলাউড়া-এক অনন্য ভূখন্ড। ৫৪৫ বর্গ কিলোমিটারের এই উপজেলায় ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের বসবাস। এখানে রয়েছে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, মণিপুরী, খাসিয়াসহ বহু জাতি সত্তার মানুষ-যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির স্থাপন করে আসছে। কুলাউড়া শুধু চা শিল্পে নয়, হাওর, বন, রেলপথ এবং প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধ। বরমচালে তেল ও গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে, রয়েছে ইউরেনিয়াম ও কাঁচবালির মতো মূল্যবান খনিজ সম্পদ। অথচ এই সম্পদশালী অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘকাল রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার হয়েছে।
তিনি বলেন, কুলাউড়ায় আমিসহ দুইজন এমপি। একজন হলেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর বাড়ি আমার নির্বাচনী এলাকা কুলাউড়ায়। আমি আশা করি, কুলাউড়ার উন্নয়নে তাঁর সার্বিক সহযোগিতা পাবো।
হাকালুকি হাওর সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হলো হাকালুকি হাওর। শীতকালে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখির আগমনে এটি পরিণত হয় অপরূপ সৌন্দরে‌্যর লীলাভূমিতে। কিন্তু অপরিকল্পিত দখল, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ এবং পরিবেশ দূষণে এই হাওরের জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে। আমি দাবি করছি-হাকালুকিকে আন্তর্জাতিক ইকো-ট্যুরিজম স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক।
চা শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে তিনি বলেন, জেলার শ্রীমঙ্গলের পরেই চা বাগানের সংখ্যায় কুলাউড়ার অবস্থান। এই চা বাগানের শ্রমিকরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, অথচ তাদের ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার অধিকার আজও নিশ্চিত হয়নি। পাশাপাশি মণিপুরী ও খাসিয়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
স্বাস্থ্যসেবার দুর্দশা দূর করা নিয়ে তিনি বলেন, কুলাউড়া উপজেলার অর্ধেকেরও বেশি পরিবার এখনো নিরাপদ পানীয়  জল থেকে বঞ্চিত। প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষের জন্য মানসম্পন্ন হাসপাতাল সুবিধা অপ্রতুল। আমি দাবি করছি, কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পূর্ণাঙ্গ জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে উন্নীত করা হোক।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রাচীনতম কুলাউড়া রেলওয়ে জংশনটি এতদ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী যোগাযোগ কেন্দ্র। কিন্তু রেলওয়ে লাইনের জরাজীর্ণ অবস্থা, অপর্যাপ্ত সড়ক সংযোগ এবং সেতু সংকট এই অঞ্চলের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। সম্প্রতি ট্রেন থেকে বগি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা রেলওয়ে অবকাঠামোর ভঙ্গুর অবস্থার জীবন্ত প্রমাণ। আমি দাবি করছি-কুলাউড়া রেল জংশনকে আধুনিকায়ন এবং উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক নেটওয়ার্ক সংস্কারে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হোক।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নিয়ে তিনি বলেন, কুলাউড়ার শিক্ষার হার মাত্র ৫১.৯ শতাংশ। যা জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২১৮ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ সীমিত। বরমচালের তেল ও গ্যাস সম্পদ এবং খনিজ সম্পদকে ব্যবহার করে এই অঞ্চলে শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক।
তিনি বলেন, কুলাউড়ার মানুষগুলো অনেক স্বপ্ন দেখেছে, অনেক অপেক্ষা করেছে। তারা সম্পদশালী একটি অঞ্চলে বাস করে, অথচ দারিদ্র ও অবহেলা তাদের নিত্যসঙ্গী। এবার তাদের প্রাপ্য অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার সময় এসেছে। বাংলাদেশ আজ নতুন করে জেগে উঠেছে। ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে। গণতন্ত্র নতুন করে শ্বাস নিচ্ছে। মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। এই অগ্রযাত্রা-এই জনজাগরণ-কোনো শক্তিই থামাতে পারবে না। পরিশেষে, আমি মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবকে দৃঢ়চিত্তে ও সর্বান্তকরণে সমর্থন করি। ইনশাআল্লাহ, কুলাউড়া এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।

কুলাউড়া উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. মছব্বির আলী তাঁর ফেসবুকে সংসদে বক্তব্যরত এমপি’র ছবি দিয়ে ক্যাপশন দেন, Morning Shows the day…

আইনজীবি এডভোকেট এবাদুর রহমান শামীম তাঁর ফেসবুকে লিখেন, এমপি মহোদয়ের সংসদে দেওয়া দুটি ভাষণ শুনেছি। তিনি কোন দীর্ঘ ভূমিকা না দিয়ে সরাসরি কুলাউড়ার প্রকৃত সমস্যাগুলো অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন। বিগত সময়ে অনেক হাই-প্রোফাইল এমপি আমাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলেও শওকতুল ইসলাম শকু সাহেবের প্রতি আমি আশাবাদী। তাঁর এই আন্তরিকতা ও বাস্তবমুখী উপস্থাপন ভবিষ্যতে কুলাউড়ার উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন।

যুক্তরাজ্য বিএনপি নেতা শরীফুজ্জামান চৌধুরী তপন তাঁর ফেসবুকে লিখেন, কর্মই মানুষের যোগ্যতা। কুলাউড়ার নানা সমস্যার বিষয় নিয়ে সাবলীল ভাষায় বক্তব্য রেখেছেন এমপি শওকতুল ইসলাম। আমরা প্রশংসা করি, কথা নয় কাজ দিয়ে আমরা প্রমাণ করবো আপনার নেতৃত্বে কুলাউড়ার মানুষের আমানত বিএনপি’র কাছে নিরাপদ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। সকল মিথ্যাচার দূরে ঠেলে সত্য উদ্ভাসিত করে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিও পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ।
উল্লেখ্য, আলহাজ শওকতুল ইসলাম শকু এমপির নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখিত বিষয়গুলোর মধ্যে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের জনবল সংকটসহ নানাবিধ সমস্যা ছিল অন্যতম। ওইসময় তিনি নির্বাচনী বিভিন্ন জনসভায় উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, কর্মচারী নিয়োগের ব্যবস্থা, বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের উপস্থিতি নিশ্চিত করে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, হাসপাতালের এক্সরে মেশিনসহ সকল পরীক্ষাযন্ত্র সচল করে জরুরি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া চা-শ্রমিক ও ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর লোকদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত, চা-শ্রমিকের মজুরী বৃদ্ধি, সু-চিকিৎসা, শিক্ষাবান্ধব স্কুলের পরিবেশ ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। বিশেষ করে হাকালুকি হাওর সহ কুলাউড়ার সকল প্রাকৃতিক স্পটগুলোকে পর্যটন শিল্পে রুপান্তরিত করার ঘোষণা দেন। সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংসদে গিয়ে প্রথমেই তিনি কুলাউড়ার সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে বক্তব্যে দিয়ে ব্যাপক প্রশংসিত হন। #

কেবিসি/ মহিউদ্দিন

Theme Developed BY NewsFresh